ঠান্ডাজ্বর সমস্যার কিছু ঘরোয়া সমাধান
ঠান্ডাজ্বর সমস্যাটি একটি সাধারণ সমস্যা হলেও এর লক্ষণগুলো খুব বিরক্তিকর। কিছুদিন ধরে জ্বর, সাথে নাকবন্ধ, হাঁচি খুশখুশে গলা কিংবা কাশি- এসবই ঠান্ডাজ্বরের লক্ষণ হতে পারে। যেহেতু এ ঠান্ডাজ্বর সমস্যাটি বহু প্রাচীন, তাই এর ঘরোয়া নিরাময় সম্পর্কেও আজ অবধি আলোচনা হয়েছে প্রচুর। যদিও অতীতের মত সরিষার প্লাস্টার কিংবা রসুনের ব্যবহার খুব একটা কার্যকর নয় বলে এখন আর খুব একটা প্রয়োগ হয় না। অবশ্য ঠান্ডাজ্বর মোকাবেলায় এখনকার ঘরোয়া পদ্ধতিগুলোর কার্যকারিতাতেও কিছুটা তারতম্য রয়েছে।
একটা প্রচলিত ধারণা হলো ভিটামিন সি কিংবা এচিনেশিয়া ঠান্ডাজ্বর ভালো করতে এবং এর প্রতিরোধে সহায়তা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী এ দু'টোর কোনটিই ঠান্ডাজ্বর সমস্যা নিরাময় কিংবা এর প্রতিরোধে খুব একটা কার্যকরী নয়।
উল্টোদিক থেকে জিংক গ্রহণ ঠান্ডাজ্বরের ব্যাপ্তি কমিয়ে আনতে বেশ সহায়ক। অবশ্য জিংক গ্রহণে যেহেতু ডায়রিয়া বা প্রচন্ড পেট ব্যথার সমস্যা দেখা দিতে পারে, তাই এটি গ্রহণের আগে বুঝে শুনে গ্রহণ করা উচিত।
ঠান্ডাজ্বরের প্রকোপ কমাতে যে খাদ্যটা বহুল প্রচলিত, সেটা হলো - চিকেন স্যুপ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চিকেন স্যুপ তার তরল, লবণ আর প্রোটিনের কারণে এ সমস্যায় ভালো উপকারে আসে। তাছাড়া এটি অরুচির সময় শরীরে শক্তিরও যোগান দিতে পারে। যেহেতু ঘরে বানানো চিকেন স্যুপে কম মাত্রার সোডিয়াম থাকে, তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটাকে ক্যান করে রাখা উচিত।
নাকবন্ধ কিংবা কাশি কমানোর জন্য অনেকে ফার্মেসির বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করে থাকেন। বেনাড্রিলের মত এন্টি-হিস্টামিন এক্ষেত্রে কার্যকর হলেও ঘুমঘুম ভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তবে এই নাকবন্ধ সমস্যা প্রশমনে একটা সরল ডিকনজ্যাস্টেন্ট আপনারা ঘরেই তৈরি করে নিতে পারেন। স্যালাইন ন্যাজাল ড্রপ- যেটা কি না তৈরি হয় লবণ আর পানির সমন্বয়ে- আপনার নাকবন্ধ সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর, যদিও সে সমস্যা (কনজেশন) আবার ফিরে আসতে পারে। এম্নিতে যাদের সাইনাস ইনফেকশন হতে পারে,বিশেষ করে তাদের বেলায় ডাক্তারেরা এসব ড্রপ সুপারিশ করে থাকেন। বলে নেওয়া ভালো- নাকবন্ধ সমস্যা নিরাময় করা না হলে ঠান্ডাজ্বর থেকে সাইনাসের ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশনের মত জটিল পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে।
বন্ধ নাক খোলার আরেকটি সহজ উপায় হলো গরম পানিতে গোসল কিংবা শুধু গোসল। তাছাড়া হিউমিডিফায়ার বা কুল মিস্ট ভ্যাপোরাইজারও এ সমস্যা মোকাবেলায় ভূমিকা রাখতে পারে, কেননা শুষ্ক বাতাস নাকবন্ধ (কনজেশন) সমস্যাকে কখনো কখনো জটিল করে। যেসব ছোট বাচ্চার বেলায় ডি-কনজ্যাস্টেন্ট খুব একটা ভালো কাজ করে না, তারা গোসল থেকে ভালো উপকৃত হয়। তাছাড়া রাতে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা হলে ঘুমের সময় বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট ও কাশি সমস্যা অনেকখানিই উপশম হতে পারে।
যুগ যুগ ধরেই মধু কাশি কমাতে বা ব্রংকাইটিস সমস্যায় একটি উল্লেখযোগ্য পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অবশ্য যেহেতু এতে বটুলিজম এর জীবাণু থাকে, তাই সতর্কতা হিসেবে মধু কখনোই এক বছরের ছোট বাচ্চাদেরকে খেতে দেওয়া উচিত নয়। যদিও সাধারণভাবে এক বছরের বেশি বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মধু খুব একটা সমস্যা তৈরি করে না, তারপরো বটুলিজম থেকে বাঁচতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম- এমন শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিতসকের পরামর্শ নিয়ে তারপর তা ব্যবহার করা উচিত।
বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই মনে করেন ঠান্ডাজ্বর সমস্যায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ফ্লুইড গ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দিনে অন্তত ছয় থেকে আট গ্লাস পানি, হার্বাল চা অথবা জুস গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত করুন, কারণ এটা আসলে শরীরকে ডি-হাইড্রেটেড করে ঠান্ডাজ্বরকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
কনজেশন সমস্যা মোকাবেলায় আরেকটা জিনিস করে দেখতে পারেন, সেটা হলো গরম সেক। নাকের দুই পাশেই গরম সেক এক্ষেত্রে ভালো কার্যকর। গরম ওয়াশক্লথ কনজেশন সমস্যায় উপকারি। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা যেনো আবার অতিরিক্ত গরম না হয়ে যায়, বিশেষত বাচ্চাদের স্পর্শকাতর ত্বকের ক্ষেত্রে।
বাচ্চাদের ঠান্ডাজ্বর হলে মায়ের বুকের দুধ তা মোকাবেলায় ভূমিকা রাখে। বেশিরভাগ সময়েই হয়তো শিশুরা অসুস্থ হলে খাওয়া দাওয়ায় সমস্যা হতে পারে, কিন্তু তখনো বুকের দুধ খাওয়া স্বাভাবিকভাবেই অব্যাহত থাকে। এ বুকের দুধ ঠান্ডাজ্বরের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। যখনই সম্ভব, তখন বাচ্চাকে ঠান্ডাজ্বর সমস্যায় বুকের দুধ খাওয়ানো হলে অসুখের ব্যাপ্তিটা কমে।
অনেক ক্ষেত্রে ঠান্ডাজ্বর মোকাবেলায় কিছু পারিবারিক ঐতিহ্য লক্ষ্য করা যায়। এসব প্রচলন অনুসরণ করার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে তা কোনভাবেই আপনার কোন ক্ষতি করবে না। উদাহরণস্বরূপ- নাকের ফুটোয় মেনথলেট প্রয়োগ ছোট বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। মনে রাখতে হবে- যে কোন অসুস্থতার ক্ষেত্রেই আমরা কি ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার করবো নাকি আরো প্রতিষ্ঠিত কোন উপায় অনুসরণ করবো - সেটা প্রয়োজনীয় মেডিকেল উপদেশ আর একটুখানি কমন সেন্স ব্যবহার করে আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
Comments
Post a Comment