কিভাবে দ্রুত বন্ধু তৈরি করবেন?
আমার জীবনের একটা ঘটনা বলি। জায়গাটা ছিলো ফ্রান্সের নিস শহর। শেষ ট্রেনটাও ততক্ষণে স্টেশন ছেড়ে গেছে। আমি তখন একেবারেই একা, শহর চিনি না, ভাষা জানি না, এমনকি পরিচিতও কেউ নেই। আমার অবস্থা এমন হয়েছিলো যে হয় আমাকে অচেনা অজানা কাউকে গিয়ে তার বাসায় থাকার জন্য অনুরোধ করতে হতো, অথবা ঘুমাতে হতো রাস্তায়। আপনারা হয়তো বলতে পারেন, শহরে কি কোন হোটেল ছিলো না? এখানেই তবে পুরো ব্যাপারটা খোলাসা করি। আমি আসলে একজন সাইন্টিস্ট। মানুষের আচরণ, সামাজিকীকরন (নেটওয়ার্কিং) আর এডভেঞ্চার- মূলত এগুলো নিয়েই আমার কাজ। তাই সেদিন আমি একটা ব্যাপার পরীক্ষা করে দেখতে চাইছিলাম, আর সেটা হলো- কত দ্রুত আমি একটা অর্থপূর্ণ সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব তৈরি করতে সক্ষম !
যাই হোক, নিজের কথা বাদ দিয়ে এ ব্যাপারে আপনাদের কিছু টিপস দেই। বলা বাহুল্য- নীচে যা যা লেখেছি, এর সবই প্রায় বিজ্ঞানভিত্তিক।
লিটমাস টেস্টঃ
ভুল জায়গায় সময় নষ্ট করবেন না। একজন মানুষ আপনার সাথে মিশতে চাইছে কি চাইছে না, কিংবা তাঁদের ব্যক্তিত্ব কেমন, এটা বোঝার জন্য অনেক রকমের পদ্ধতি আছে। যেমন কেউ সৎ নাকি অসৎ, সেটার ব্যাপারে একটা ধারণা পেতে তাকে একটা প্রশ্ন করতে পারেন। প্রশ্নটা হলো- 'দোকানের একজন কর্মচারী তার মালিকের ক্যাশবাক্স থেকে বছরে গড়ে কত টাকা চুরি করতে পারে?' যদি কেউ এ প্রশ্নের উত্তরে টাকার পরিমাণটা অনেক বেশি বলে, সেক্ষেত্রে ধ্রণা করা হয় যে ঐ ব্যক্তিটি অসৎ। কারণ সাধারণত মানুষ অন্যকেও তার নিজের মত মনে করে। একইভাবে যদি বুঝতে চান একজন মানুষ এনভেঞ্চারাস কি না , তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করুন- "আপনার জীবনে সব থেকে এক্সাইটিং কোন কাজটা আপনি করেছেন?" আবার কারো দিকে সৌহার্দ্যসূচক হাত নাড়ালে প্রতি-উত্তরে কেউ যদি আপনাকেও হাত নাড়ায়, তবে অনুমান করা হয় যে ব্যক্তিটি মিশুক। এছাড়া কেউ আত্মকেন্দ্রিক কি না সেটা বোঝার জন্য তার কপালে E অক্ষরটা আকতে বলুন। যদি ঐ E তাদের দিকে মুখ করে থাকে, তাহলে হতে পারে তারা আত্ম-কেন্দ্রিক।
শুধু একটা বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে- এগুলো সবই ধারণা নির্ভর বা অনুমানভিত্তিক কথা। নিশ্চিত কোন কিছু নয়।
বেন ফ্র্যাংক্লিন ইফেক্ট
গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে- কেউ যদি আপনার জন্য ছোটখাট কোন কাজ করার সুযোগ পায়, তবে আপনার সাথে তাদের সম্পর্কটাও তৈরি হতে পারে দ্রুত। মনে রাখবেন- আপনার এবং কারো মধ্যকার সম্পর্কের পেছনে যদি তার ছোটখাট কোন প্রচেষ্টা বা উপকারও থাকে, তবে সেটা ঐ ব্যক্তির সাথে আপনার সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বলেই গণ্য হবে। এক্ষেত্রে শুরু করতে পারেন - তার সাথে দেখা করার সময় চেয়ে, বা একসাথে কফি খাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে। শুধু একটা জিনিস খেয়াল রাখবেন- সম্পর্কটা যেনো ভারসাম্যপূর্ণ হয়। অর্থাৎ আপনি শুধু তার কাছ থেকে উপকার নিয়েই গেলেন, বিনিময়ে তাকে কিছু দিলেন না -এমনটা যেনো না হয়।
একই রকম ব্যাকগ্রাউন্ড খুঁজে বের করুন
গবেষণা থেকে দেখা গেছে- একই ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করাটা সহজ। তবে যদি সেটা না থাকে, তাহলে? সেক্ষেত্রে চেষ্টা করুন একই রকম কাজ বা লক্ষ্যে জড়িয়ে পড়তে। অর্থাৎ, যদি একজন ব্যক্তি আর আপনার লক্ষ্য একই হয়, সেক্ষেত্রে তার সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করাটা তুলনামূলক সহজ।
মিস-এট্রিবিউশন অফ এরাউজাল
ইংরেজিতে মিস-এট্রিবিউশন অফ এরাউজাল বলে একটা কথা আছে। সোজা বাংলায় এর মানেটা হলো- মানুষ উত্তেজিত অবস্থায় নিজের অনুভূতিকে অন্যের জন্যও প্রযোজ্য বলে মনে করতে পারে, কিন্তু আসলে হয়তো সেটা সত্যি নয়। একটা উদাহরণ দিলে হয়তো বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ধরা যাক- আপনি কোন একটা কমেডি ক্লাবে গিয়েছেন। এখন এটার জন্য আপনাকে অনেকের কাছে - আপনি যতটা না মজার, তার থেকে আরো অনেক বেশি 'ফানি' বা মজার মানুষ বলে মনে হতে পারে। কিংবা কোন একটা বিপজ্জনক কাজে আপনার অংশগ্রহণ আপনাকে করে তুলতে পারে আরো আকর্ষণীয়.... সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এ মনস্তত্বের সুবিধাটুকু কাজে লাগান।
সমাপ্তিটা সুন্দর করুন
এক গবেষণায় দেখা গেছে- কারো সাথে কাটানো সময়টুকু যতই সুন্দর হোক না কেন, তার সমাপ্তিটা যদি সুন্দর না হয়, তাহলে সেটা খুব একটা ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। তাই চেষ্টা করুন, যার সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছেন, তার সাথে প্রতিবার কাটানো সময়ের শেষটুকু যেনো সুন্দর হয়।
প্রথমে নিস শহরর কাহিনী দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটা আপনাদের মনে আছে নিশ্চই। সে রাতে উপরের টেকনিক আর টিপসগুলো প্রয়োগ করে আমি বেশ ভালো উপকার পেয়েছিলাম। প্রথমে আমি একটা বারে ঢুকে চারজনের একটা দলের দিকে বিয়ার টোস্ট করলাম (লিটমাস টেস্ট), তারপর ট্রিট হিসেবে তারা আমাকে আরেক রাউন্ড খাওয়ালো (বেন ফ্র্যাংক্লিন ইফেক্ট), প্রচুর ড্রিংক করে উত্তেজিত অবস্থায় তারা সেই মিস-এট্রিবিউশনের দিকে গেলো। এভাবেই তারা আমাকে তাদের গেস্ট রুমে রাতে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো শেষমেষ।
Comments
Post a Comment